ভ্রমণকন্যাদের গল্প

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে খোলা একটা গ্রুপ দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল ট্রাভেলেট্স অব বাংলাদেশের। ২০১৬ সালের শেষদিকে যখন গ্রুপটি খোলা হয়, তখন এর সদস্য ছিলেন মাত্র বিশ-পঁচিশজন নারী। গ্রুপ খোলার উদ্যোক্তারা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি তাদের এই ‘ক্লোজ্ড গ্রুপ’টি একসময় পঁচিশ হাজার সদস্যের পুরোদস্তুর সংগঠনে রূপ নেবে। ট্রাভেলেট্স অব বাংলাদেশের এই সদস্যদের নাম ভ্রমণকন্যা, যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের গ-িকে ছাপিয়ে ঘুরে বেরাচ্ছেন দেশের আনাচেকানাচে। শুধু তাই নয়, পর্যটনশিল্পের প্রসার ও নারীদেরকে ভ্রমণে আগ্রহী করার পাশাপাশি নিরাপদ ভ্রমণ নিয়ে তাদের রয়েছে নানাবিধ ভাবনা

শুরুর গল্প

ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ডা. সাকিয়া হক ও ডা. মানসী সাহা দুই বন্ধু। তাদের হাত ধরে ট্রাভেলেট্স অব বাংলাদেশের সূচনা। এই দুই বন্ধুর ছোটবেলা কেটেছে খুলনায়। খুলনার সরকারি করোনেশন বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও খুলনা সরকারি মহিলা কলেজে পড়াশোনা করেছেন একসঙ্গে। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তারা দুরন্ত ছিলেন। বন্ধুদের মধ্যে আড্ডা, একসঙ্গে দলবেঁধে এলাকায় ঘুরে বেড়ানো, খুনসুটিসহ নানা পাগলামোর অভ্যাস তো ছিলই, সব সময় তারা ভাবতেন সুযোগ পেলেই দেশ ঘুরতে বের হবেন। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই আর অন্যদশজন মেয়ের মতো তারাও বড় হয়েছেন রক্ষণশীল পরিবারে। ফলে ইচ্ছা থাকলেও সুযোগ হতো না। তাছাড়া ভ্রমণে যাবার জন্য অন্য মেয়েসঙ্গীও পাওয়া যেত না। পরিবার ছাড়া তাদের প্রথম ভ্রমণ ছিল কুয়াকাটায়। সেবার দুই বিদেশি বান্ধবী তাদের সঙ্গী হয়েছিলেন। উচ্চমাধ্যমিকের পর ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হবার পরই সেই সুযোগ হয়। এরপর থেকে নিয়মিতই বিভিন্ন ভ্রমণ গ্রুপের সাথে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে গেছেন তারা। মূলত ঘুরে বেড়ানোর অদম্য নেশা ছিল বলেই মেডিকেল কলেজের পড়াশোনার চাপ সামলেও এই কাজ করা সম্ভব হয়েছে। তবে তারা সবসময় মনে করতেন দলবেঁধে একদল নারী মিলে ঘুরতে পারলে আনন্দের মাত্রাটা বোধহয় আরো বাড়ত, আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আরো উপভোগ করা যেত। 
সাকিয়া ভ্রমণে গিয়ে ক্যামেরায় প্রকৃতির ছবি তুলতেন। সেই আগ্রহ থেকে ভাবলেন আলোকচিত্র প্রদর্শনী করবেন। কিন্তু তেমন কোনো নারী ভ্রমণকারীর সাড়া পাওয়া গেল না। নারীদের কোনো সংগঠনও ছিল না। পরে সাকিয়া ও মানসী দুই বান্ধবী মিলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটা গ্রুপ খোলার সিদ্ধান্ত নেন। সমমনা বিশ-পঁচিশজনকে যুক্ত করে ২০১৬ সালের ২৭ নভেম্বর খোলা হলো ‘ট্রাভেলেট্স অব বাংলাদেশÑ ভ্রমণকন্যা’ নামের ফেসবুক গ্রুপটি। তখনও তারা ভাবেননি, একদিন এই গ্রুপের হয়েই তারা ঘুরে বেড়াবেন সারাদেশ, আর সঙ্গে যোগ দেবেন আরও অনেক নারী। দুই বছর পেরুতে না পেরুতেই পঁচিশ সদস্যের সেই গ্রুপের সংখ্যা ২৫ হাজার পেরিয়েছে। ফেসবুকে রয়েছে ফ্যানপেজও, সেখানে যুক্ত আছেন সাড়ে ১৪ হাজার মানুষ। আর ওয়েবসাইটের মাধ্যমেও তুলে ধরা হচ্ছে ভ্রমণবিষয়ক নানা তথ্য।
শুরুর দিকেই অনলাইনভিত্তিক ভ্রমণ গ্রুপ হিসেবে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন পেয়েছিল ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ। গেল বছর পেয়েছে সিআরআই-এর জয়বাংলা ইয়ূথ অ্যাওয়ার্ড। ১৮ জন কার্যকরী সদস্য নিয়ে রয়েছে পুরোদস্তুর সাংগঠনিক কাঠামো। এরমধ্যে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে রয়েছেন গৃহিণীও। ডা. সাকিয়া তাদের সভাপতি ও ডা. মানসী সাধারণ সম্পাদক। সংগঠনের উদ্যোগে দু’বারের বর্ষপূর্তিতে প্রকাশ হয়েছে ‘ভ্রমণকন্যা’ নামের ভ্রমণবিষয়ক ম্যাগাজিন।

ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে

২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে নরসিংদীতে ছিল ট্রাভেলেট্স অব বাংলাদেশের প্রথম ভ্রমণ। সেবার অংশ নেন ১৯ জন নারী। মেঘনা নদী ভ্রমণ, দিগন্তবিস্তৃত সরিষা খেতে ঘুরে ঘুরে ছবি তোলা, বস্ত্রকল দেখা সবমিলিয়ে ভ্রমণের গল্প ও ছবিগুলো এতটাই আকর্ষণীয় হয়েছিল যে, তা ফেসবুক গ্রুপে যুক্ত সদস্যদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এরপরের ট্যুর ছিল ঢাকার দোহারে মৈনাকঘাটে। সেখানে ৩০জন যাওয়ার কথা থাকলেও শেষপর্যন্ত সদস্যসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫১জনে। বাসভাড়া নিয়ে পূর্ণিমার রাতে বেরিয়ে পড়েন তারা। উপভোগ করেন চাঁদের আলোর স্নিগ্ধতা।
সাধারণত বেড়াতে যাবার জন্য প্রথাগত রিসোর্ট বা পর্যটনকেন্দ্র বলতে যা বোঝায়, সেসব জায়গায় কমই গিয়েছে দলটি। বরং শুরু থেকেই তাদের উদ্দেশ্য ছিল নারীরা মিলে একসঙ্গে হয়ে নিত্যনতুন জায়গা ঘুরে দেখবেন।

You may also like...